
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামে আয়োজিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুস। আগামী শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিতব্য এ জুলুসকে ঘিরে ইতোমধ্যে নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের আমেজ। জুলুসকে ঘিরে নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে বিভিন্ন আলোকসজ্জা, বেলুন ও পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে।
শনিবার সকাল থেকে মুরাদপুরের খানকা শরিফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে জুলুস। এরপর মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি মোড় হয়ে এটি শেষ হবে জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা মাঠে। সেখানে দেশখ্যাত আলেম-ওলামারা বক্তব্য রাখবেন এবং শেষে দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত হবে। জুলুসের নেতৃত্ব দেবেন আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মা.জি.আ)। বিশেষ মেহমান হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ্ (মা.জি.আ) ও সৈয়্যদ মুহাম্মদ মেহমুদ আহমদ শাহ্ (মা.জি.আ)।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি , নিউমার্কেট, মুরাদপুর , বহদ্দারহাট ও নতুন ব্রিজ এলাকাসহ সর্বত্র ঝলর বাতি, রঙ্গিন কাগজ ও গেইট করে সাজানো হয়ে। রঙ্গীন কাগজে লিখা আছে- মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স:) কে নিয়ে নানান উক্তি , মনীষিদের লেখা ও বিভিন্ন ইসলামিক বাণী। আর সাজানো এসব স্থান দেখতে শহরের বাসিন্দারা ভীড় জমান, তুলেন ছবি আর মাতেন উৎসবে। যেন শহরের বুকে নতুন এক উৎসব।
ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপানে এমন আয়োজন প্রতি বছরই করে থাকে চট্টগ্রামের আহালে সুন্নাত তরীকার অনুসারীরা। এমন উৎসবের আমেজ নিয়ে রায়হান নামে, “একজন বলেন- প্রতি বছর এমন একটি দিনের জন্যে আমরা অপেক্ষা করি। এদিন আমরা আমাদের মহানবী (সঃ) এর আগমন দিনটাকে আনন্দ উৎসবে উদযাপন করি।”
আজ শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের মুরাদপুরস্থ জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার মাঠে লাখো মুসল্লির ঢল নামে। সকাল থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মুসল্লিরা জামিয়ার দিকে ছুটে আসতে থাকেন। কেউ হেঁটে, কেউ রিকশায়, কেউবা বাস ও ট্রাকে চড়ে নামাজের মাঠে উপস্থিত হন।

ঐতিহাসিক এ জুমার নামাজে ইমামতি করেন জশনে জুলুসের নেতৃত্বদানকারী আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মা.জি.আ)। নামাজ শেষে লাখো মুসল্লি একসাথে হাত তুলে দোয়া করেন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি, ভ্রাতৃত্ব ও দেশের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য।
জামিয়ার মাঠে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিরা জানান, এ আয়োজন তাদের ঈমানকে দৃঢ় করে এবং ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও মজবুত করে। পটিয়া থেকে আসা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ‘প্রতি বছর আমরা এই দিনের অপেক্ষায় থাকি। লাখো মুসল্লির মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হয় আমরা যেন সমুদ্রের এক ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে গেছি। রাসুল (সা.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ এই আয়োজন।’
ফটিকছড়ি থেকে আসা মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘জুলুস কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়, এটি আমাদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। চট্টগ্রামবাসী হিসেবে আমরা গর্ব করি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জুলুস আমাদের শহরে অনুষ্ঠিত হয়।’
জামিয়ার এক ছাত্র জানান, ‘আমাদের কাছে এই ঈদ সব থেকে আনন্দের হয়। অন্য দুই ঈদে সবাই নিজ নিজ মতো থাকে, কিন্তু এ ঈদে ৭০-৮০ লাখ মানুষ একত্র হয়। এই মিলনমেলাই সবচেয়ে সুন্দর।’
জুলুস মিডিয়া কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবু তালেব বেলাল জানান, ‘মুসল্লিরা যাতে নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করতে পারেন এবং আগামীকালের জুলুসে অংশ নিতে পারেন সে জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকরা দিনরাত কাজ করছেন। নগরের প্রতিটি সড়কে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এবারের জুলুসে কোটি মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এই আয়োজন ইসলামী ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।’

প্রসঙ্গত, প্রায় একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই জুলুস। আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে শুরু হয়েছিল এ আয়োজন। ধীরে ধীরে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতি বছর এ আয়োজনে অংশগ্রহণ বাড়ছে। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়েছে।
এআরই/দেশবিদেশ