
ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা ১ মিনিট ছুঁতেই শুরু হবে ১৬ ডিসেম্বর , বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম গৌরবের দিন, মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনেই পাক হানাদার বাহিনীর দীর্ঘ নির্যাতন ও নিপীড়নের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তিযোদ্ধারা ছিনিয়ে এনেছিলেন লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা।
প্রতি বছর বিজয় দিবস এলেই শহরজুড়ে চোখে পড়ে মৌসুমি পতাকা বিক্রেতাদের। ফেরি করে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন স্বাধীনতার অর্জিত পতাকা। যার ওপর নির্ভর করে অনেকের রুজি-রোজগার। তবে এবারের বিজয় দিবসে সেই চিত্রটা ভিন্ন। অন্যান্য বছরের তুলনায় নানা কারণে উৎসবের আমেজ কম থাকায় রাতের বেলাতেই হতাশায় ভুগছেন এসব মৌসুমি বিক্রেতারা। কাঙ্ক্ষিত বিক্রি না হওয়ায় লাল-সবুজের পতাকা হাতে নিয়েও তাদের চোখে-মুখে নেই আগের সেই আনন্দের ঝিলিক।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত এলাকা ঘুরে কয়েকজন পতাকা বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলা হলে তাদের মুখে হাসি দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীরা জানান, আগের বছরের তুলনায় এ বছর জাতীয় পতাকার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তাদের মতে, পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটই এই মন্দার অন্যতম কারণ।
গত এক দশক ধরে জাতীয় দিবসগুলোতে পতাকা বিক্রি করে আসছেন শামসুদ্দিন মাতব্বর। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ছয় দিনের ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি টেকেরহাট থেকে চট্টগ্রামে এসেছেন। তবে দেশের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’খ্যাত এই নগরী এবার তাকে হতাশ করেছে।
শামসুদ্দিন জানান, গত ১০ বছরের মধ্যে তিনি গর্বের সঙ্গেই এই ব্যবসা করেছেন। কিন্তু নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পালিত এবারে বিজয় দিবসেই তাকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।
তিনি বলেন, “এবার বিজয় দিবস নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক কম। অনেক জায়গায় শোনা যাচ্ছে , এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে বিজয় দিবস আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে না। এসব কথার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্রেতাদের মনোভাবের ওপর। ফলে জাতীয় পতাকার প্রতিও আগ্রহ কমে গেছে।”
ব্যবসায় ধসের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে তিনি তুলে ধরেন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে। তার মতে, বিগত সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চেতনার অতিরিক্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রদর্শনের কারণে এখন লাল-সবুজের পতাকাকেও কেউ কেউ প্রশ্নের মুখে ফেলছেন। পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক বিরোধ জাতীয় চেতনার প্রকাশকে আরও সংকুচিত করছে বলেও তিনি মনে করেন।
শুধু শামসুদ্দিন নন, কথা হয় রফিক নামে আরেকজন পতাকা বিক্রেতার সঙ্গেও। তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে প্রতিবছর বিজয় দিবসের আগের দিনগুলোতে জাতীয় পতাকা বিক্রি করে আসছেন। দীর্ঘ এই অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীও এবার লোকসানের মুখে পড়েছেন।
হতাশার সুরে রফিক বলেন, “প্রতি বছর বিজয় দিবসের আগের রাতে ৭-৮ হাজার টাকার পতাকা বিক্রি করতাম। কিন্তু এবার তার অর্ধেকও বিক্রি করতে পারিনি।” ব্যবসায় মন্দার জন্য তিনিও দেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করেন।
মানুষ কেন পতাকা কিনছে না, এ প্রশ্নে রফিক বলেন, “এখন মানুষের কাছে উৎসবের আমেজের চেয়ে আতঙ্কই বেশি। বেশিরভাগ মানুষ রাত ৯-১০টার মধ্যেই বাসায় ফিরে যায়। সবার মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি কাজ করছে।”
এআরই/দেশবিদেশ