শেফালী ঘোষের মাইজভান্ডারী গান।। ডা. বরুণ কুমার আচার্য





শেয়ার

শেফালী ঘোষ। খ্যাতি যার চট্টগ্রামের কিংবদন্তী আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী। ২০০৬ সালে বছরের শেষ সূর্যাস্তের সাথে এই গুণী শিল্পী ৬৬ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। এর আগে দীর্ঘদিন ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়া গ্রামে ১৯৪১ সালের ১১ জানুয়ারী বাবা কৃষ্ণ গোপাল ও মা আশালতা ঘোষ দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তাঁর শৈশব কেটেছে। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। 

 

প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন স্থানীয় মুক্তাকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরিবারের অনুপ্রেরণায় বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তাঁর গান গাওয়ার ও শেখার সূত্রপাত ঘটে। তাঁর গানের প্রথম ওস্তাদ ছিলেন তেজেন সেন। পরবর্তী ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্র, জগনান্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মিহির নদী, গোপালকৃষ্ণসহ অনেক সংগীতজ্ঞের কাছ থেকে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন। শেফালী ঘোষ চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতিকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে তুলে ধরেন যা উপমহাদেশের সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে। মাটির গান, মনের গান, প্রেম বিরহের সুরের ইন্দ্রজালে বন্ধি করেন লাখো দর্শককে। ৩ দশকের  সঙ্গীত জীবনে কেবলি মুগ্ধ করে গেছেন কোটি শ্রোতার হৃদয়। গেয়েছেন ২ হাজারেরও বেশী আঞ্চলিক ভান্ডারী মারফতি গান। 

 

তখনকার সময়ে পাড়া মহল্লার গানের আসর, মেলা, পূজা-পার্বণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ড উপলক্ষে নাচ-গান, নাটক, কবিগান, পালাগান, জারিসারি, মুর্শিদী, ভাটিয়ারী, কাওয়ালী কীর্তন ও যাত্রাগানের যেসব আয়োজন হত সেখানে সবার আকর্ষণের মধ্যবিন্দু থাকতেন শেফালী ঘোষ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শিল্পী প্রায় পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে প্রায় দুই হাজার গান গেয়েছেন। তাঁর গাওয়া গান নিয়ে দুই শতাধিকের বেশি এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বেতারের তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক ১৯৬৩ সালে শেফালী ঘোষ ও আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে আঞ্চলিক ভাষায় গান গাইতে প্রস্তাব দিলে দুইজনই রাজি হন এবং তাঁদের দ্বৈত কণ্ঠের গান ব্যপক পরিচিতি লাভ করে। তাঁর মায়াবি কণ্ঠের গান সবাইকে আকর্ষণ করতো। ভরাট গলায় দরদি ও উদার কণ্ঠে গ্রাম বাংলার লোকজ সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে আর কোন শিল্পী এতো সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন কিনা তা বলা দুস্কর। 

 

সাম্পান ওয়ালা, মালকাবানু, মধুমিতা, বসুন্ধরা, মাটির মানুষ, স্বামী, মনের মানুষ, বর্গী এলো দেশে প্রভৃতি চলচ্চিত্রসহ প্রায় ২০টি চলচ্চিত্রে তিনি প্লেব্যাক করেছেন। সংগীতের পাশাপাশি যাত্রা ও মঞ্চনাটকেও তার নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, কাতার, ওমান, কুয়েত, ভারত, মায়ানমার, বাহারাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় ২০টিরও অধিক দেশে তিনি গান গেয়ে চট্টগ্রামের তথা সারা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। পেয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক পদক, বাংলা একাডেমি আজীবন সম্মাননা পদক, শিল্পকলা একাডেমি পদক, একুশে পদকসহ অর্ধশতাধিক সম্মাননা। 

 

আমাদের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানেরও আছে বিশেষ একটি আবেদন এবং এ গান আমাদের চট্টগ্রাম তথা দেশীয় সংস্কৃতির অন্যতম একটি অংশও বটে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম থেকে উদ্ভুত আরেক বিশেষ ধারার গানের নাম মাইজভা-ারী গান। জানা যায় মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভব ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মহান ধর্মসাধক হযরত গাউসুল আজম মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (১৮২৬-১৯০৬) প্রবর্তিত মাইজভাণ্ডারী তরিকার অনুষঙ্গ হিসাবে মাইজভাণ্ডারী গানের প্রচলন। একজন মহান সুফী সাধক ও মাইজভাণ্ডারী তরীকার প্রতিষ্ঠাতা তিনি। মাইজভাণ্ডারী ধারার অনুসারীদের গাওয়া এক ধরণের মরমী গানই হচ্ছে মাইজভাণ্ডারী গান। মাইজভাণ্ডারী তরিকার যারা প্রবর্তক তাঁরা কেউ এ ধরণের গান লিখে যাননি। বরং তাঁদের আশেক বা ভক্তগণই তাঁদের গুণগান, কীর্তি, মহিমা বর্ণনা করে গান রচনা করেছেন এবং এই ধারা আজো প্রবাহমান। লোকসঙ্গীতের ধারায় এই ধারার গান রচিত হয় সৃষ্টিকর্তাকে উপলক্ষ করে। মুলতঃ মাইজভা-ারী গানের রচয়িতা হলেন মাইজভাণ্ডারের বিভিন্ন শ্রেণির ভক্তপ্রাণ মানুষ। শত বর্ষের পথ পরিক্রমায় মাইজভাণ্ডারী গান সাধন ভজনের নির্ধারিত গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণে এখনো ভূমিকা রেখে যাচ্ছে নিরন্তর। এই গানের তাল, লয়, ছন্দ গানে এক ধরণের দারুণ আবহ সৃষ্টি করে, যা সহজেই শ্রোতাদের মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। 

 

মাইজভাণ্ডারী গানের এই ক্রমবিকাশমান ধারায় এবং সারা বিশ্বে তার আবেদন ছড়িয়ে দেবার পেছনে তাঁরা হলেন মওলানা  সৈয়দ আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী, মাওলানা সৈয়দ আবদুছ ছালাম ভূজপুরী, মাওলানা সৈয়দ আবদুল গণি কাঞ্চনপুরী,  সৈয়দ আমিনুল হক ধর্মপুরী, কবিয়াল রমেশ শীল, আব্দুল গফুর হালী ও মহি আল-ভাণ্ডারী প্রমুখ মাইজভাণ্ডারী গানের সর্বকালের মহান রচয়িতা এবং আধুনিক নবযুগের অন্যতম দিকপাল। পরবর্তিতে কবিয়াল রমেশ শীলের মাইজভাণ্ডারী গান সাধারণ মানুষের মনের খোরাগে পরিনত হয়। দরবারী মজলিশ থেকে এ গান চলে আসে সভা, সমাবেশ ও গ্রামীণ লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এই গানগুলো জনপ্রিয় হওয়ার পিছনে কন্ঠশিল্পীদের অবদান অতুলনীয়। গ্রাম-মহল্লায় যে কোন আসরে একটি মাইজভাণ্ডারী গান থাকতেই হয়। তা না হলে যেন অনুষ্ঠান সফল হয় না। এটি লোকালয়ের খেটে খাওয়া মানুষের মনের চাহিদা। সে ক্ষেত্রে যে কোন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাইজভাণ্ডারী গানের একছত্র দখল ছিল শেফালী ঘোষের কন্ঠে। 

 

শেফালী ঘোষের কন্ঠে মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভাবক হযরত সৈয়দ আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরী রচিত  ১. কে দিলো জ্বালাইয়ে বলো কারো নিঠুর মন ২.আমার প্রাণ হরে যায় আমার দিল হরে যায় ৩.না জানি কি গুণ আছে চরণে তোমার ৪.আমি কি পাবো তাহারে, সদা মনে প্রাণে ভালোবাসি যাহারে ৫.আমার প্রাণ ভোমরা আয়গো হৃদ বাগানে ৬. চলো গো প্রেম সাগরে। হযরত সৈয়দ বজলুর করিম মন্দাকিনী রচিত ১. কে তুমি হে সখা আড়ালে থাকিয়া হরিলে আমারি প্রাণ ২.এক বিনা দ্বিতীয় নাস্তি সকল ধর্মে একই তত্ত্ব ৩.আমি যে পাতকী পাপী মহাদোষে দোষী হই। রমেশ শীলের কিছু বিখ্যাত মাইজভাণ্ডারী গান। ১.গাউছুল আজম বাবা নূরে আলম, তুমি ইছমে আজব বাবা তরানেওয়ালা ২.আজব কারিগর বন্ধুয়া আজব কারিগর ৩.দেখা দিও প্রাণবন্ধু আজ নিশীতে ও নিদানের বন্ধু আমার গাউছুল আজম মাইজভাণ্ডারী ৪.মাইজভাণ্ডারী মাওলা আমার পরাণের পরাণ ৫. একলা বসে বিরহ বাসে তোমারি আশেক গাহিব গান ৬.একি চমৎকার, ভান্ডারেতে আজগুবি কারবার ৭. ভাণ্ডারী রহিম রহমান, কে বুঝিতে পারে তোমার কুদরতী গুলশান ৮.গাউছুল আজম মাওলা ধন ৯. আধাঁর ঘরত রাইত কাডাইওম কারে লই ১০. হযরত সৈয়দ আমিনুল হক ধর্মপুরীর ১। তোরা দেখবি যদি খোদার ঘর, ২। মাইজভান্ডারী নূর নগরী বাবা মওলা ধন। আবদুল গফুর হালী রচিত - ১. দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে হইতেছে নুরের খেলা’, ২.মাইজভাণ্ডারে কী ধন আছে চামড়ার চোখে দেখবি না ৩.আর কতকাল খেলবি খেলা ৪.নতুন ঘরে যাব আমার এই ঘরে আর মন বসে না ৫.নাচ মন তালে তালে মাওলার জিকিরে ৬. তোরা ভালমন্দ যা খুশি বল, পরোয়া আমি করি না ৭. কোন সাধনে তারে পাওয়া যায় ৮.আমি আমারে বেইচা দিছি মাইজভা-ারে যাই রে,আমার কিছু নাই ৯.কাষ্টের উপর চামড়া দিয়ে কে বানাইল ঢোল,এই ঢোলরে কে শিখাইল আল্লাহ আল্লাহ বোল ১০. বাজারে বাজারে তোরা মাইজভাণ্ডারী ঢোল। সৈয়দ মহিউদ্দীন ( প্রকাশ মহি-আল ভাণ্ডারী ) রচিত ১. আমার সকল ব্যবসা গুনাগারী যায় ২. চার তরিকার চৌমুহনী মাইজভাণ্ডারে যারে যা। ৩. আঁরে কন কামত বাজাই রাখিলা গাউছে মাইজভাণ্ডার ( চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়)। এরকম শতাধিক মাইজভাণ্ডারী গানগুলো যেন সাধারণ মানুষকে স্রষ্টার বিভোরতায় মুগ্ধ করে রাখতেন। শেফালী ঘোষ নেই। তার কন্ঠের গান মাইজভাণ্ডারী আশেকদের প্রাণে এখনো সুরে সুরে ধ্বনি তোলে। সৃষ্টি যখন স্রষ্টার প্রেমে বিভোরতায় কলমে আছড় তুলে আর গায়ক যখন তাল, সুর, লয় দিয়ে কন্ঠে গা ভাসায়, তখন লেখক আর শ্রোতার মনে দাগ কাটে  সেখানেই স্রষ্টার প্রেমের স্বার্থকথা। এভাবে শেফালী বেঁচে থাকুক অগণিত মাইজভাণ্ডারী আশেক ভক্তদের হৃদয়ে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে রইল অকুন্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মুক্তমত


শেয়ার