আর্জেন্টাইন সুপারক্লাসিকোর পাগলামি, ব্রাজিলের ‘ফ্লা-ফ্লু’





শেয়ার

শুধু ইউরোপই নয়, অন্যান্য মহাদেশেও এমন অনেক শহর আছে, যার বাসিন্দারা ফুটবলের মধ্যেই জীবনের অর্থ খুঁজে পান। সপ্তাহান্তে নিজেদের দল ম্যাচ জিতলে বাকি ছয় দিন রাস্তাঘাটে কলার উঁচিয়ে চলার প্রেরণা পান। নিছক খেলা নয়, তাঁদের কাছেও ফুটবল ম্যাচে জয় মানে শহরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অন্যতম মাপকাঠি। ফুটবলপাগল এই শহরগুলোই খেলাটার আধিপত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে প্রতিনিয়ত। ইউরোপ ছাড়া বাকি বিশ্বের এমন কিছু ফুটবলপাগল শহরের গল্প পড়ুন আজ শেষ পর্বে।

মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকো
শহরের সফলতম দল ক্লাব আমেরিকার মূল ‘শত্রুতা’ মূলত ক্রুজ আজুল আর ইউএনএএম পুমাসের সঙ্গে। ঐতিহ্যগতভাবেই ক্লাব আমেরিকা বিত্তবানদের ক্লাব হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৯ সাল থেকে ক্লাব আমেরিকার মালিকানা ‘গ্রুপো তেলিভিসা’ নামক মিডিয়া কোম্পানি নিয়ে নেওয়ার পর সে পরিচিতি আরও বেড়েছে। ওদিকে ইউএনএএম পুমাসকে বলা হয় শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্লাব, বুদ্ধিজীবীদের ক্লাব। একই কথা প্রযোজ্য ক্রুজ আজুলের ক্ষেত্রেও। যেখানে আজুল বা ইউএনএএম পুমাস খেলোয়াড় গড়ে তোলার আঁতুড়ঘর, সেখানে ক্লাব আমেরিকা দেশের তারকাদের কিনে আনতেই বেশি আগ্রহী। সাফল্যের দিক দিয়েও সেটার প্রতিফলন দেখা যায়। লিগে সবচেয়ে সফল দল ক্লাব আমেরিকা। মহাদেশীয় প্রতিযোগিতাতেও তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নাতীত।

উল্লেখযোগ্য ক্লাব : ইউএনএএম, ক্লাব আমেরিকা, ক্রুজ আজুল
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : হুগো সানচেজ, হুয়ান ইতুর্বে, এদুয়ার্দো হেরেরা (ইউএনএএম)
মিগেল জেলেদা, মারিও পেরেজ, ক্রিস্তোবাল ওর্তেগা (ক্লাব আমেরিকা)
সেবাস্তিয়েন অ্যাব্রু, কার্লোস হার্মোসিও (ক্রুজ আজুল)

উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
ইউএনএএম পুমাস - মেক্সিকান লিগ (৭), মেক্সিকান কাপ (১), মেক্সিকান সুপার কাপ (২), কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়নস লিগ (৩), দ্বিতীয় বিভাগ (১)
ক্লাব আমেরিকা - মেক্সিকান লিগ (১৩), মেক্সিকান কাপ (৬), মেক্সিকান সুপার কাপ (৬), কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়নস লিগ (৭)
ক্রুজ আজুল - মেক্সিকান লিগ (৮), মেক্সিকান কাপ (৪), মেক্সিকান সুপার কাপ (৩), কনক্যাকাফ চ্যাম্পিয়নস লিগ (৬), দ্বিতীয় বিভাগ (১)

রিও ডি জেনিরো, ব্রাজিল
ব্রাজিলের ফুটবল-সত্তার বিশাল একটা অংশ গড়ে দিয়েছে দেশটার রাজধানী রিও ডি জেনিরো। সাফল্যের দিক দিয়ে সবাই-ই মোটামুটি কাছাকাছি। তবে একটু হলেও এগিয়ে আছে ফ্লামেঙ্গো। অথচ একটা অন্তঃকলহ না হলে হয়তো জন্মই হতো না জিকো রোমারিওদের সাবেক ক্লাবটার। ফ্লুমিনেন্স ক্লাবের অন্তঃকলহের জের ধরে ব্রাজিলের খেলোয়াড় আলবার্তো বোর্গার্থ ফ্লামেঙ্গোতে চলে যান। ফ্লামেঙ্গো ফুটবল খেলত না, রোয়িং ক্লাব ছিল। বোর্গার্থের অনুরোধে ফুটবল বিভাগের জন্ম দেয় ফ্লামেঙ্গো। এর পরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে চলার। এই দুই ক্লাবের বৈরিতার জন্মও এখান থেকে। তবে এই বৈরিতা জন্মের জন্য কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন সাবেক ব্রাজিলীয় সাংবাদিক মার্কো ফিলহো। রোমাঞ্চকর এই ডার্বির নাম তিনিই প্রথম ‘ফ্লা-ফ্লু’ রাখেন। ত্রিশের দশকে স্থানীয় সংবাদপত্রে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তিনি। ঘোষণা দেন, আগামী ‘ফ্লা-ফ্লু’ ডার্বিতে যে দলের সমর্থকেরা মাঠে সবচেয়ে সুন্দর পরিবেশের সৃষ্টি করতে পারবে, তারাই জিতবে। আমোদপ্রিয় রিওর বাসিন্দারা প্রস্তাবটা দুহাত ভরে নেয়। এর পর থেকে ‘ফ্লা-ফ্লু’ ডার্বি শুধুই ফুটবলীয় দ্বৈরথই নয়, বরং একটা উৎসব। বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে দুই দলই তাঁদের ঘরের ম্যাচগুলো খেলে। দ্বৈরথ সৃষ্টির কান্ডারি মার্কো ফিলহো নামানুসারে যে স্টেডিয়ামের আনুষ্ঠানিক নামই দেওয়া হয়েছে ‘এস্তাদিও জোর্নালিস্তা মার্কো ফিলহো।’

ওদিকে এক গবেষণায় জানা গেছে, গোটা ব্রাজিলের মোটামুটি সাড়ে চার কোটি মানুষ হয় ফ্লামেঙ্গো, নয় ভাস্কো দা গামা সমর্থন করেন। যে কারণে এই দুই দলের ডার্বির নাম হয়ে গেছে ‘ক্লাসিকোস দস মিলোয়েস’ অর্থাৎ, মিলিয়ন মানুষের ক্লাসিকো। যুগ যুগ ধরে ভাস্কোর রবের্তো বনাম ফ্লামেঙ্গোর জিকো কিংবা ভাস্কোর বেবেতো ও ফ্লামেঙ্গোর তিতা এই ডার্বির পতাকা বহন করে চলেছেন। ফ্লুমিনেন্সের সঙ্গে ভাস্কোর ডার্বি আবার ‘ডার্বির দাদু’ নামে পরিচিত। কারণ, এই দুই ক্লাবই শহরের প্রাচীনতম ক্লাব। ওদিকে ভাস্কো ও বোটাফোগো ক্লাবের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকার কারণে এই ক্লাব দুটির ডার্বিকে ‘বন্ধুত্বের ডার্বি’ বলা হয়।

উল্লেখযোগ্য ক্লাব : ফ্লামেঙ্গো, ফ্লুমিনেন্স, ভাস্কো দা গামা, বোটাফোগো
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : জিকো, রোমারিও, বেবেতো, আদ্রিয়ানো, দিয়েগো আলভেস, লিওনিদাস, হুলিও সিজার, রোনালদিনহো, তিতা (ফ্লামেঙ্গো)
টেলি সান্তানা, ফ্রেড, কাস্তিলহো, কার্লোস আলবার্তো, থিয়াগো সিলভা, দিদি, রিভেলিনো (ফ্লুমিনেন্স)
মাজিনহো, জুনিনহো, রোমারিও, এদমুন্দো, ভাভা, বেবেতো, রবের্তো (ভাস্কো দা গামা)
গারিঞ্চা, হেলেনো দি ফ্রেইতাস, মারিও জাগালো, জেয়ারজিনহো, জেফারসন, মাউরো গালভাও, দিদি, নিলটন সান্তোস, গারসন (বোটাফোগো)
উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
ফ্লামেঙ্গো - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৬), রাজ্য শিরোপা (৩৬), কাপ (৩), সুপার কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (২), রিকোপা সুদামেরিনাকানা (১)
ফ্লুমিনেন্স - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৪), রাজ্য শিরোপা (৩১), কাপ (১)
বোটাফোগো - ব্রাজিলিয়ান লিগ (২), রাজ্য শিরোপা (২৫)
ভাস্কো দা গামা - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৪), রাজ্য শিরোপা (২৪), কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (১), দ্বিতীয় বিভাগ (১)

বুয়েনেস এইরেস, আর্জেন্টিনা
ইতিহাস, ঐতিহ্য, উন্মাদনা-সব দিক দিয়েই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমহর্ষক ডার্বি বোকা জুনিয়র্স ও রিভার প্লেটের ‘সুপারক্লাসিকো’। কয়েকটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। দু বছর আগে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস এইরেসের এক লোক তাঁর শ্যালকের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে গেছে। কেন? কারণ তাঁর শ্যালক ছিল রিভার প্লেটের সমর্থক, আর সে নিজে বোকা জুনিয়র্সের! ২০১৫ সালের কোপা লিবার্তোদোরেসের নকআউট রাউন্ডে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। বোকা সমর্থকদের ‘পেপার স্প্রে’ এর আক্রমণে বেশ কয়েকজন রিভার প্লেট খেলোয়াড়কে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। সে ম্যাচ পরে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়, পরের রাউন্ডে উঠে রিভার প্লেট। সে আসরে লিবার্তোদোরেসের শিরোপা জিতেই বোকা জুনিয়র্স কে জবাব দেয় রিভার প্লেট।

 

নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন রিভার প্লেট কিংবদন্তি ড্যানিয়েল প্যাসারেলা, এই ম্যাচে খেলতে নেমেই। রিভারপ্লেটের আরেক খেলোয়াড় আলেহান্দ্রো ডমিঙ্গেজ মারামারি করতে ২০১২ সালের এক ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন, লাল কার্ড পাওয়ার পর আবার সেই অফিশিয়ালকেই মারতে উদ্যত হয়েছিলেন তিনি! রিভার প্লেটের স্ট্রাইকার সেবাস্তিয়েন দ্রুইসিকে মারতে গিয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন বোকা জুনিয়র্সের চার খেলোয়াড় - পাবলো পেরেজ, হুয়ান ইনসরালদে, দারিও বেনেদেত্তো ও রিকার্ডো সেঞ্চুরিয়ন। দুই দলের দুই কোচকেও লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দেওয়া হয় ডাগআউট থেকে। ২০০৪ সালে কোপা লিবার্তো লিবার্তোদোরেসের সেমিফাইনালে বোকা জুনিয়র্স এর হয়ে গোল করে মুরগির মতো নেচে নেচে উদ্‌যাপন করেন স্ট্রাইকার কার্লোস তেভেজ, যা তাতিয়ে দেয় রিভার প্লেট সমর্থকদের ; তাদের বোকা সমর্থকেরা মুরগি বলেই ক্ষ্যাপায় কি না!

এ রকম শত শত ঘটনার জন্ম দিয়েছে এই দুই ক্লাব। শতবর্ষী এই দ্বৈরথে প্রতি বছরই এ রকম মারামারি, হানাহানি হয়েই থাকে। বোকা-রিভার প্লেট দ্বৈরথে এত বেশি সংঘর্ষ হয় যে এখন বোকা জুনিয়র্সের মাঠে খেলা হলে রিভার প্লেটের সমর্থকেরা দেখতে যেতে পারেন না। রিভার প্লেটের মাঠে খেলা হলে একই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হয় বোকা জুনিয়র্স-সমর্থকদের ক্ষেত্রেও। দুই দলের সমর্থকের সহিংস মনোভাবের কারণেই বিরক্ত হয়ে ২০১৩ সাল থেকে এই নিয়ম চালু করেছে আর্জেন্টাইন ফেডারেশন। এখন আমাকে বলুন, এমন কোন দ্বৈরথ কি দেখেছেন যেখানে উত্তেজনার স্ফুলিঙ্গ এ রকম ভীষণভাবে ছড়ায়? এক জরিপে দেখা গেছে, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি সমর্থনপুষ্ট দল এই দুই ক্লাব। পুরো জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ সমর্থন করে বোকা জুনিয়র্সকে আর ২৪ শতাংশ রিভার প্লেটকে। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই এই দুই দলের কাউকে না কাউকে সমর্থন করে। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ঘরোয়া লিগের সবচেয়ে বেশি শিরোপা এই দুই দলেরই।

উল্লেখযোগ্য ক্লাব : বোকা জুনিয়র্স, রিভার প্লেট, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, ভেলেজ সার্সফেল্ড, সান লরেঞ্জো, হুরাকান
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : ডিয়েগো ম্যারাডোনা, হুয়ান রিকেলমে, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, কার্লোস তেভেজ, সিলভিও মারজোলিনি, আন্তোনিও রাতিন (বোকা জুনিয়র্স)
ড্যানিয়েল পাসারেলা, আলফ্রেডো ডি স্টেফানো, এনজো ফ্রানসেস্কোলি, আরিয়েল ওর্তেগা, ওমর সিভোরি, হার্নান ক্রেসপো (রিভার প্লেট)
ডিয়েগো ম্যারাডোনা, হুয়ান পাবলো সোরিন, ফরিদ মনদ্রাগন, ফার্নান্দো রেদোন্দো, হোসে পেকারম্যান (আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স)
অস্কার রুগেরি, হোসে লুইস চিলাভার্ট, ডিয়েগো সিমিওনে, কার্লোস বিয়াঞ্চি (ভেলেজ সার্সফেল্ড)
এজেকিয়েল লাভেজ্জি, লুইস মন্তি, অস্কার রুগেরি, পাবলো জাবালেতা (সান লরেঞ্জো)
আলফিও বাসিলে, রেনে হাউসম্যান, গিলেরমো স্তাবিল (হুরাকান)
উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
বোকা জুনিয়র্স - আর্জেন্টাইন লিগ (৩৪), আর্জেন্টাইন কাপ (৩), আর্জেন্টাইন সুপার কাপ (১), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (৩), কোপা লিবের্তাদোরেস (৬), কোপা সুদামেরিকানা (২), রিকোপা সুদামেরিকানা (৪)
রিভার প্লেট - আর্জেন্টাইন লিগ (৩৬), আর্জেন্টাইন কাপ (৩), আর্জেন্টাইন সুপার কাপ (১), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (৪), কোপা সুদামেরিকানা (১), রিকোপা সুদামেরিকানা (৩)
আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স - আর্জেন্টাইন লিগ (৩), কোপা লিবের্তাদোরেস (১)
ভেলেজ সার্সফেল্ড - আর্জেন্টাইন লিগ (১০), আর্জেন্টাইন সুপার কাপ (১), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (১), রিকোপা সুদামেরিকানা (১)
সান লরেঞ্জো - আর্জেন্টাইন লিগ (১৫), আর্জেন্টাইন সুপার কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (১), কোপা সুদামেরিকানা (১)
হুরাকান - আর্জেন্টাইন লিগ (৫), আর্জেন্টাইন কাপ (১), আর্জেন্টাইন সুপার কাপ (১)

পোর্তো আলেগ্রে, ব্রাজিল
শহরে ক্রুজেইরোর মতো ক্লাব থাকা সত্ত্বেও সবচেয়ে রোমহর্ষক ডার্বির খেতাব পাবে ‘গ্রে-নাল’ ডার্বি। গ্রেমিও আর ইন্তারনাসিওনালের এই ডার্বি যুগ যুগ ধরে জন্ম দিয়েছে অনেক তারকা। রোনালদিনহোর কথাই ধরুন। ১৯৯৯ সালের ডার্বিতে নাটমেগ আর ড্রিবলসে পসরা সাজিয়ে জয়সূচক গোল তো করেছেনই, উল্টো ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিলেন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও ইন্তারনাসিওনালের দুঙ্গাকে। এ ম্যাচের কথা উঠলেই ইউরিকো লারার কথা মনে আসতে বাধ্য। গ্রেমিওর এই গোলরক্ষকের হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা ছিল। ১৯৩৫ সালের গ্রেনাল ডার্বির আগে ডাক্তার সতর্ক করে দিয়েছিলেন, বেশি মানসিক চাপ যেন না নেন লারা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সে ম্যাচে লারা খেলেছিলেন, পেনাল্টিও আটকেছিলেন নিজ ভাইয়ের। কিন্তু প্রচণ্ড উত্তেজনার প্রভাব পড়ে হৃৎপিণ্ডে। দুই মিনিট পর মাঠ থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয় তাঁকে, জানা যায়, এরপরেই মারা যান লারা। এসব ছোট ছোট আরও অনেক কাহিনি ফুটবলীয় রূপকথার অংশ করে দিয়েছে এই ডার্বিকে। কিছুদিন আগেও, গ্রেনাল ডার্বিতে লাল কার্ড দেখেছিলেন আটজন। ভাবা যায়!

উল্লেখযোগ্য ক্লাব : গ্রেমিও, ইন্তারনাসিওনাল, ক্রুজেইরো
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : রোনালদিনহো, এমারসন, মারিও জারডেল, রেনাতো গাউচো, আলসিনহো (গ্রেমিও)
ক্লদিও তাফারেল, দুঙ্গা, ফালকাও, ভালদোমিরো (ইন্তারনাসিওনাল)
দিদা, হুয়ান পাবলো সোরিন, লুইসাও, জি কার্লোস, রোনালদো, টোস্টাও, মাইকন (ক্রুজেইরো)
উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
গ্রেমিও - ব্রাজিলিয়ান লিগ (২), রাজ্য শিরোপা (৩৮), কাপ (৫), সুপার কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (৩), রিকোপা সুদামেরিনাকানা (২), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (১)
ইন্তারনাসিওনাল - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৩), রাজ্য শিরোপা (৪৫), কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (২), কোপা সুদামেরিকানা (১), রিকোপা সুদামেরিনাকানা (২), ক্লাব বিশ্বকাপ (১)
ক্রুজেইরো - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৪), রাজ্য শিরোপা (৩৯), কাপ (৬), কোপা লিবের্তাদোরেস (২), রিকোপা সুদামেরিনাকানা (১)

মন্তিভিদিও, উরুগুয়ে
শহরে প্রধানতম দুই ক্লাবের বৈরিতার মূলে রয়েছে সুতীব্র জাতীয়তাবোধ। ব্রিটিশ রেলকর্মীদের কল্যাণে ১৮৯১ সালে জন্ম নেয় পেনারল। আর তাদের দেখে দেখে শুধু উরুগুয়ের ছেলেরা যেন খেলতে পারে, সে উদ্দেশ্যে ১৮৯৯ সালে সৃষ্টি হয় নাসিওনালের। ১৮৯১ সালে সিইউআরসিসি নাম নিয়ে জন্ম নেওয়া পেনারল বর্তমান নামে থিতু হয় ১৯১২ সালের দিকে। আর তাতেই নাসিওনালের ঘোর আপত্তি! তাদের মতে, সিইউআরসিসি ও পেনারল আলাদা ক্লাব। ১৯১২ থেকে ১৯১৪ সালের কিছু সময় তাঁরা একে অপরের বিপক্ষে ম্যাচও খেলেছে। তাহলে তাঁরা এক হয় কী করে? যদিও নাসিওনাল সমর্থকদের এই দাবির সপক্ষে কোনো অকাট্য যুক্তি প্রমাণ মেলেনি। আজ পর্যন্ত এই জিনিস নিয়ে ঝগড়া করে যায় দুই দলের সমর্থকেরা। কারণ ওই যে, কোনোভাবে যদি প্রমাণ করা যায়, পেনারলের জন্ম ১৯১২ সালে, তাহলে তো নাসিওনাল মন্তিভিদিওর প্রাচীনতম ক্লাব হয়ে যাবে!
১৯৩০ সালে উরুগুয়ের বিশ্বকাপ জয়ের পর এই দ্বৈরথের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ১৯৫০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের স্কোয়াডে নয়জন ছিলেন পেনারলের খেলোয়াড়, ছয়জন নাসিওনালের। শহরের বাইরের কোনো ক্লাব থেকে কেউই জায়গা পাননি। ফলে গোটা দেশে এই দুই ক্লাবের সমর্থন বাড়তে থাকে হু হু করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, গোটা উরুগুয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ বাসিন্দা হয় পেনারল, নয় নাসিওনালের সমর্থক!
উল্লেখযোগ্য ক্লাব : নাসিওনাল, পেনারল
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : রদোলফো পিনি, আনিবাল পাজ, হুলিও পেরেজ, পাবলো ব্যারিয়েন্তোস (নাসিওনাল)
লুইস কুবিলা, ওবদুলিও ভারেলা, আলসিদেস ঘিগিয়া, হুয়ান শিয়াফিনো (পেনারল)
উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
নাসিওনাল - উরুগুইয়ান লিগ (৪৭), সুপার কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (৩), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (৩), রিকোপা সুদামেরিকানা (১)
পেনারল - উরুগুইয়ান লিগ (৫০), সুপার কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (৫), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (৩)সাও পাওলো, ব্রাজিল

রিও ডি জানেইরোর ডার্বিগুলো যেমন উৎসবমুখর হয়, সাও পাওলোর অবস্থা আবার তেমন নয়। এখানে ফুটবল ম্যাচে জয় হার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো মূল্যে জয় যেন চাই-ই চাই। শহরের সবচেয়ে বড় ডার্বি ‘পলিস্তা ডার্বি’ - করিন্থিয়ানস ও পালমেইরাসের মধ্যে। শহরের প্রাচীনতম ক্লাব থেকে ইতালীয় বংশোদ্ভূত কয়েকজন বের হয়ে আলাদা ক্লাব গঠন করেন গত শতাব্দীর শুরুর দিকে। ব্যস, ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান তাঁরা। সূত্রপাত ঘটে ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান এই বৈরিতার। শিরোপার দিক দিয়ে প্রত্যেক ক্লাবই কাছাকাছি। পেলে, নেইমার, কাফু, কার্লোসের মতো প্রতিভাদের উত্থান ঘটেছে এই শহর থেকেই।

উল্লেখযোগ্য ক্লাব : পালমেইরাস, সান্তোস, সাও পাওলো, করিন্থিয়ানস
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : কাফু, জালমা সান্তোস, হোসে আলফাতিনি, রবার্তো কার্লোস (পালমেইরাস)
রোজারিও চেনি, লিওনিদাস, কাফু, কারেকা, ফালকাও, রাই, লিওনার্দো, সার্জিনহো (সাও পাওলো)
পেলে, জিতো, ক্লদোয়ালদো, কার্লোস আলবার্তো, রবিনহো, নেইমার, কুতিনহো (সান্তোস)
কার্লোস গামারা, পাওলিনহো, সক্রেটিস, রিভেলিনো, কার্লোস তেভেজ (করিন্থিয়ানস)
উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
পালমেইরাস - ব্রাজিলিয়ান লিগ (১০), রাজ্য শিরোপা (২৪), কাপ (৩), কোপা লিবের্তাদোরেস (১)
সান্তোস - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৮), রাজ্য শিরোপা (২২), কাপ (১), কোপা লিবের্তাদোরেস (৩), রিকোপা সুদামেরিকানা (১), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (২)
সাও পাওলো - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৮), রাজ্য শিরোপা (২১), কোপা লিবের্তাদোরেস (৩), কোপা সুদামেরিকানা (১), রিকোপা সুদামেরিকানা (২), ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ (২), ক্লাব বিশ্বকাপ (১)
করিন্থিয়ানস - ব্রাজিলিয়ান লিগ (৭), রাজ্য শিরোপা (৩০), কাপ (৩), কোপা লিবের্তাদোরেস (১), রিকোপা সুদামেরিকানা (১), ক্লাব বিশ্বকাপ (২)

কায়রো, মিসর
বৃহত্তর কায়রো শহরের এই দুই ক্লাব শুধু মিসরই নয়, গোটা আফ্রিকারই সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দল। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম আফ্রিকান ক্লাবের তালিকায় এই আল আহলি ও জামালেক যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল। এই দুই ক্লাবের ‘শত্রুতা’ এতটাই বেশি, যে ১৯৭১-৭২ মৌসুমে এই দুই দলের মধ্যকার এক ম্যাচকে ঘিরে সমর্থকদের সংঘর্ষের কারণে বাকি লিগই বাতিল করে দেওয়া হয়। তবে ঘরোয়া লিগ হোক বা আন্তর্জাতিক/মহাদেশীয়, আল আহলির মোট শিরোপা জামালেকের প্রায় দ্বিগুণ।

উল্লেখযোগ্য ক্লাব : আল আহলি, জামালেক
শহরে উল্লেখযোগ্য যারা খেলে গেছেন : মোহামেদ আবুত্রিকা, এসাম এল হাদারি, মাহমুদ আল খাতিব (আল আহলি)
আমের জাকি, শিকাবালা, আবদেল হালিম আলি (জামালেক)
উল্লেখযোগ্য শিরোপা :
আল আহলি - মিসরীয় লিগ (৪১), মিসরীয় কাপ (৩৬), মিসরীয় সুপার কাপ (১১), সিএএফ চ্যাম্পিয়নস লিগ (৮), সিএএফ কাপ উইনার্স কাপ (৪), সিএএফ কনফেডারেশনস কাপ (১), সিএএফ সুপার কাপ (৬), আফ্রো-এশিয়ান কাপ (১), আরব ক্লাব চ্যাম্পিয়নস কাপ (১), আরব কাপ উইনার্স কাপ (১), আরব সুপার কাপ (২)
জামালেক - মিসরীয় লিগ (১২), মিসরীয় কাপ (২৭), মিসরীয় সুপার কাপ (৪), সিএএফ চ্যাম্পিয়নস লিগ (৫), সিএএফ কাপ উইনার্স কাপ (১), সিএএফ কনফেডারেশনস কাপ (১), সিএএফ সুপার কাপ (৪), আফ্রো-এশিয়ান কাপ (২), আরব ক্লাব চ্যাম্পিয়নস কাপ (১)

ফুটবল


শেয়ার