‘দাম নির্ধারণ করে তো লাভ হয় না’





শেয়ার

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নাভিশ্বাস মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষের। বাজারে এখনো অধিকাংশ পণ্যের দাম চড়া। আলু-পিঁয়াজের পর নতুন করে চাল ও তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও ব্যবসায়ীরা তাতে কর্ণপাত করছেন না। দাম তো কমছেই না, বরং বাড়তির দিকে। ফলে স্বল্প ও মধ্যআয়ের মানুষেরা তাদের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মানবজমিনকে বলেন, বর্তমানে পণ্যমূল্যের দাম বিশ্বের সব দেশেই চড়া। বিশ্ববাজারে বিশেষ করে ভোজ্যতেলের দাম বেশি বেড়েছে।

 

বিশ্ববাজার এক ধরনের সাপ্লাই কন্ট্রাকশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে সেটি হয়েছে। আমদানি রপ্তানির স্বাভাবিক যে প্রক্রিয়া সেটি এখনো ফেরেনি। চাহিদাও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি ভারসাম্যহীন অবস্থা তৈরি হয়েছে। এটিই এসব কিছুর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারতো চাল-তেলের দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে না। দিলেও তবে তাতে কোনো লাভ হয় না। তাতে ব্যবসায়ীদের কোনো যায় আসে না। সেটি তারা গ্রাহ্যও করবে না। বাজার চলবে বাজারের নিয়মে। সরকারের সিদ্ধান্ত এখানে অপ্রয়োজনীয়। এটা কোনো কাজে লাগে না। সেটিই এখন দেখতে পাচ্ছি। তো মোটামুটিভাবে চালের দাম আগামী মে মাস পর্যন্ত চড়া থাকবে বোরো ধান না ওঠা পর্যন্ত। সরকার আগে থেকে চাল আমদানি করে নাই। সেজন্য এখন খেসারত দিতে হচ্ছে।
তবে ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে এখানে কিছু করার ছিল না। দাম বেড়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। এখানে সরকারের কিছু করার ছিল না। সরকারের যেটা দেখা উচিত ছিল, মার্কেট ম্যানুপুলেট হচ্ছে কি-না। বড় বড় কোম্পানি তাদেরকে মনিটরিং করা খুব সহজ। বিশ্ববাজারে যদি বেশি হয় তাহলে সেটাকে কন্ট্রোলে নিয়ে আসতে হবে। অবশ্য পিঁয়াজ-আলুর দাম কিছুটা কমেছে। সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য এটা দাম কমেছে। সেজন্য সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন তার ওপর বাজার নির্ভর করে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে, সরবরাহ কমলে দাম বাড়বেÑ এটিই স্বাভাবিক। সামনে বোরো ধান উঠলে চালের দাম কমবে। যদি ফসল ভালো হয়, সরবরাহ যদি বাড়ে সেক্ষেত্রে অবশ্যই দাম কমবে। সম্ভাবনা আছে সারাদেশে বোরোর আবাদ ভালো হওয়ার। যদি বন্যা না হয় সেক্ষেত্রে অবশ্যই সরবরাহ বাড়বে, বাম্পার ফলন হলে সরবরাহ বাড়লে অবশ্যই চালের দাম কমবে।
তিনি বলেন, এটি ঠিক যে মানুষের আয় কমেছে, ব্যয় বেড়েছে। এটি খুব দুঃখজনক। এখানে সরকার পার্যাপ্ত আমদানি করতে পারছে না। সরকার যেটা করে, তারা উৎপাদন বেশি করে দেখায়। কিন্তু বন্যার কারণে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেটা দেখায় না। বন্যায় ফসল নষ্ট হয়। ২০১৮-২০১৯ সালে হয়েছে। গত বছর হয়েছে। সেজন্য ফসল নষ্ট হয়েছে। ফলে সরবরাহ কমে গিয়েছে। এতে দামও বেড়েছে। সেজন্য সময়মতো চাল আমদানি করা দরকার ছিল। এখানে সরকারের দাম নির্ধারণের কোনো প্রয়োজন নেই। সরবরাহের ওপর জোর দিতে হবে। পরে যে আমদানি করা হয়েছে সেটি তুলনামূলক খুবই কম। আমি প্রথম থেকে বলছিলাম যে ৩০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে, সেখানে মাত্র করেছে ১ দেড় লাখ টন। ৫-৭ লাখ টন দিয়েই বা কি হবে? যেখানে দরকার ৩০ লাখ টন। আর এত দেরিতে চাল আমদানি করে কি লাভ হবে? আবার তো বোরোর সিজন চলে আসছে। এটা অনেক আগে আমদানি করা উচিত ছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যে গত বছর ধান ওঠার পরও চালের দাম কমেনি। সাধারণত গতবছর বন্যার কারণে অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। এ সময় বিশাল একটি ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় আমন ধান একদমই হয়নি। কৃষকরা ক্ষেত থেকে ঘর পর্যন্ত উঠাতে পারেনি। গরুকে খাওয়ানোর জন্য খড় পর্যন্ত তুলতে পারেনি।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, তেলের ব্যাপারে সরকারকে দেখতে হবে বাজারে যে দামে আছে সেটা যৌক্তিক কি-না। দাম যদি বেশি থাকে, যদি ডাবল হয়ে থাকে তাহলে তো কিছু বলার নেই। কারণ তেল তো বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশে তেল উৎপাদন হয় না। এটি বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। যদি দেখা যায় যে দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হয়েছে তাহলে যারা আমদানি করে, তারা যদি দাম বেশি নিয়ে থাকে তাহলে তাদেরকে সরকার চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে মূল বিষয় হচ্ছে বহির্বিশ্বে ভোজ্য তেলের দাম অনেক বেশি, ডাবল হয়েছে। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখানে সিন্ডিকেট বলতে কোনো কিছু নেই। কেউ চাইলে খুঁজলেও সিন্ডিকেট পাবে না। তবে এক্ষেত্রে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে থাকতে পারে। সেটা সরকারের মনিটরিং করতে হবে। আসলে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। কারণ আজকে যদি চালের দাম বেড়ে যায়। ধরুন আমি চালের ব্যবসা করি। চালের দাম ছিল ৫০ টাকা, আজকে হলো ৭০ টাকা। তাহলে আমি কি করবো? আমি ছোটখাটো ব্যবসায়ী। আমি তো ৭০ টাকা দিয়েই বিক্রি করবো। আমি ৫০ টাকা দিয়ে বিক্রি করবো না। এখানে আমি তো অসৎ না। কারণ পরের দিন আমাকে ৭০ টাকা দিয়েই কিনতে হবে। তাহলে আমি কি অসৎ? আমাকে দোষ দিয়ে কি লাভ? আমাকে দেখতে হবে যে, আমি যে ১ মণ চাল বিক্রি করলাম, সেই ১ মণ চাল বাজার থেকে আনতে হলে কত টাকা দিতে হবে? কাজেই বলে লাভ নেই যে আগে কিনেছি। এখানে ভবিষ্যতে কিনতে কত টাকা লাগবে তার ওপর বর্তমান দাম নির্ধারণ করবে।

অর্থ ও বাণিজ্য


শেয়ার